বাহরুল উলূম হযরত শাহ্ মাওলানা মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন রাহ. -এর জীবন, আদর্শ, কর্ম ও অবদান

মাহবুবে যমান, রাহবরে আ’লী, আল্লামতুদ্দাহার, গরীব পরওয়ার, মিসকীন নওয়াজ, যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, মুফাসসির, আলেমকুল শিরোমণি, বায়তুশ শরফের পীর, আন্তর্জাতিক স্কলার, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লি. ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লি. এর শরীয়াহ্ সুপারভাইজরি কমিটির চেয়ারম্যান বাহরুল উলূম হযরত শাহ্ মাওলানা মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন রাহ. ছিলেন বায়তুশ শরফ দরবারের প্রাণ প্রতিষ্ঠাতা কুতুবুল আলম, শাহসূফী, হযরত মাওলানা মীর মুহাম্মদ আখতর রাহ. ও হাদিয়ে যমান হযরত শাহ্সূফী মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল জব্বার রাহ. -এর সুযোগ্য একমাত্র খলিফা এবং আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স.)-এর একজন সফল উত্তরসুরি যুগশ্রেষ্ঠ আল্লামা।

তিনি ছিলেন এমন একজন রাহবারে আলি যিনি এ জগতে তাঁর কর্ম সাধনা, রিয়াযত, মুরাকাবা, মুশাহাদা, মুজাহাদার ফলস্বরূপ মানুষের হৃদয় কন্দরে ধ্রুবতারার মত উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক রূপে আলো বিকিরণ করে চলেছেন। তিনি উস্তাজুল আসাতিজা, হাজার হাজার আলেমদের শিক্ষক, প্রজ্ঞাবান, বিচক্ষণ, ধীশক্তিসম্পন্ন ও ভারসাম্যপূণ্য অত্যন্ত উঁচুমাপের আলেম ও স্কলার ছিলেন। তাঁর মত এ মানের আলেম বা স্কলার বাংলাদেশ সহ ভারতীয় উপমহাদেশে একেবারেই হাতে গোনা। তিনি সমকালীন আল্লামাদের কাছে জ্ঞান সাধনার অদ্বিতীয় স্বীকৃতি স্বরূপ ‘বাহরুল উলূম (জ্ঞানের সমুদ্র) থেকে ‘বিহারুল উলূম’ উপাধী প্রাপ্ত হয়েছিলেন। 

খ্যাতিমান অনেকের জ্ঞানের পরিধির সীমারেখা নির্ণয় করা যায়। কারো জ্ঞান-গুণ সম্পর্কে মন্তব্যও করা যায়। কিন্তু মহাসাগরের জলবিন্দু কিংবা তরঙ্গমালা যেমন সঠিক হিসাবে ফেলা যায় না তেমনি জ্ঞানের মহাসাগর (বাহরুল উলূম থেকে বিহারুল উলূম) এর জ্ঞানের পরিধির সীমারেখাও নির্ণয় করা  যায় না। খাটে না কোন মন্তব্য। তিনিই শাহ মাওলানা মুহাম্মদ কুতুব উদ্দীন (রহমতুল্লাহি আলাইহি)।

তিনি মহাকালের কণ্ঠস্বর। যাঁর স্বর-সুর শুনলেই বুঝা যায় এ কোন অনুশীলনের নয়, না কোন প্রচেষ্টায় অর্জিত। এ স্বর-সুর একমাত্র সাধনার এবং একান্তই স্রষ্টা প্রদত্ত। বায়তুশ শরফের মহান পীর ছাহেব শাহ মাওলানা মুহাম্মদ কুতুব উদ্দীনের হাসিমুখের সংলাপ, ওয়াজ এবং মঞ্চে দরাজ কণ্ঠে উচ্চারিত নিজেরই লেখা হামদ-নাত, নজরে আকীদাত, মরসিয়া কাব্য শুনার পর যে কোন শ্রোতার কাছে মনেহয় এ কোন মানুষ নয়, তিনি আল্লাহ্ প্রদত্ত মানুষ রূপি এক বিশেষ সত্তা।

 তিনি ছিলেন একাধারে আলেমকুল শ্রেষ্ঠ, সুলেখক, পরমতসহিঞ্চু ধীমান আলেম, গবেষক, ওলামাদের ঐক্যের মুকুট, ভারসাম্যপূর্ণ আলোচক ও সমাজ সংস্কারক।

ইসলামের ইতিহাসে ওয়াজের মাধ্যমেই দাওয়াতের কাজের গতি পেয়েছে। ইসলামের এ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টি ভারতীয় উপমহাদেশে ঐতিহ্য লাভ করেছে। উপমহাদেশে যেখানেই মুসলমান আছে, সেখানেই ওয়াজের সুর ফুটেছে। ওয়াজ বা নছীহত দ্বীনের তাবলীগের অপরিহার্য অংশ। যুগে যুগে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার জন্য ওয়াজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ওয়াজ শুনতে ভালবাসেন, ওয়াজের কথা শুনলেই অনেক মানুষ দূর-দূরান্তে ছুটে যান। মানুষের ধর্মীয় ও নৈতিক উন্নতি হল ওয়াজের মূল বিষয়। ওয়াজ হলো মানুষকে দ্বীনের প্রতি আহ্বান। হৃদয় নিংড়ানো কথা ও উপদেশপূর্ণ বাণীর মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার মাধ্যম। ওয়াজ শুনলে মুমিনের মৃত প্রায় ঈমান সতেজতা লাভ করে, তেল ফুরিয়ে যাওয়া প্রদীপে তেল প্রাপ্তি হয়। তাই দুনিয়ার সব ধরনের লাভ ও লোভের মোহমুক্ত হয়ে আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মানুষকে ওয়াজ শোনাতে হয়। ওয়াজ শুনে আল্লাহ ভোলা মানুষেরা হৃদয়ের খোরাক লাভ করে।

তদুপরি মানুষের ব্যক্তি জীবনের পরিশুদ্ধি ও আকিদা বিশ্বাসের সংশোধনের ক্ষেত্রে ওয়াজ মাহফিলের গুরুত্ব অপরিসীম। মুসলমানদের ঈমান-আকীদা ও আমলী সংশোধন, আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং যুগ সচেতন হওয়ার আহবান করতেন ওয়াজে। তৎকালীন ওলামা ও বুজুর্গানে দ্বীনদের কাছে ইখলাছ ও লিল্লহিয়াতের কোন ঘাটতি ছিল না।

সমাজের মানুষের দ্বীনী চেতনা জাগ্রত করার ক্ষেত্রে ওয়াজ মাহফিলের ভূমিকা অনেক। মানুষকে দ্বীনের পথে, হিদায়তের পথে, আত্মশুদ্ধির পথে, ইশকে ইলাহী-ইশকে রাসূলের পথে আহবানের জন্য ওয়াজের বিকল্প নেই, এ চিরন্তন সত্য উপলব্ধি করে বাহরুল উলূম হযরত শাহ্ মাওলানা মুহাম্মদ কুতুব উদ্দীন উত্তাল যৌবনের প্রারম্ভেই ‌‘১৭ বৎসর’ বয়স থেকে ওয়াজের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং আমৃত্যু তিনি হিদায়তের এ মহান ব্রতকে নিজের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য মনে করতেন। তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় ওয়ায়েজদের অন্যতম ছিলেন। তাঁর ওয়াজ যাদুর মত স্পর্শ করত মানুষের হৃদয়।  

বাংলাদেশে পঞ্চাশের দশকে মাদরাসা শিক্ষায় যে সকল ছাত্র সর্বাধিক প্রশংসা ও নানা স্বীকৃতি অর্জন করেছেন তাদের অন্যতম শাহ মাওলানা কুতুব উদ্দীন। তিনি চট্টগ্রামের উম্মুল মদারেস খ্যাত দারুল উলূম আলিয়া মাদরাসা হতে ১৯৫৯ ইং সালে কামিলে স্বর্ণপদকসহ ১ম বিভাগে ১ম স্থান অধিকার করে কামিল পাস করেন।

তিনি একজন যুগের শ্রেষ্ঠ আরবী, উর্দূ ও ফার্সী কবি ছিলেন। হামদ-নাত ও ইসলামি ভাবধারার কবিতা রচনায় তার দক্ষতা কিংবদন্তি তুল্য। তথাপি তিনি অসংখ্য ফরমায়েশি কবিতা ও মরসিয়া লিখেছেন। 

তিনি একাধারে আরবি, ফার্সী ও উর্দু ভাষাবিদ ছিলেন। আরবি ভাষায় তাঁর অপরিসীম দক্ষতা ও আরবি ব্যাকরণ শাস্ত্রে তাঁর পান্ডিত্যে আরববাসীও স্তম্ভীত হয়ে যেত।

১৯৯৮ সালে তিনি বায়তুশ শরফের পীর হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়ে সার্থকভাবে ত্বরীকতের কাজ করে গেছেন। তাঁর আরবী, উর্দু ও ফার্সী ভাষার এক হাজার কবিতার বিশাল সংকলন “গুলহায়ে আকীদাত” এক ব্যাপক সমাদৃত কাব্যগ্রন্থ। তাঁর রচিত “জান্নাতি ও জাহান্নামি যারা”, ‘কিতাব ও সুন্নাহ্র আলোকে ত্বরীকতের মূলনীতি’, ‘বেশারতুল ইখওয়ান ফি-খাওয়াচ্ছিল কুরআন’, তাঁর ওয়াজের সংকলন ‘নির্বাচিত ভাষণ’, সর্বশেষ কিতাব তাঁর ওয়াজের আরো একটি সংকলন ‘হেদায়তের আলো’ গ্রন্থসমূহ পাঠক সমাজে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়েছে।

এ মহান সর্বগুণে গুণী, সমকালিন অলি আউলিয়াদের মাথার মুকুট তুল্য ব্যাক্তিত্ব, লক্ষ লক্ষ ভক্ত-অনুরক্ত, মুরীদ, শুভানুধ্যায়ী, স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়স্বজন, পাড়া, প্রতিবেশীদের কে শোক সাগরে ভাসিয়ে মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে ২০ মে ২০২০ইং মোতাবেক ২৬ রমজান ১৪৪১ হিজরী, ০৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বাংলা রোজ বুধবার দুপুর ২.৩০ মি. ঢাকা, ধানমন্ডি, আনোয়ার খান মেডিকেল কলেজে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সেই সাথে ৮২ বছরের বর্ণাঢ্য আলীশান জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

তাঁর বিশাল ব্যাক্তিত্ব আমাদের কাছে স্বশরীরে জীবন্ত উপস্থিত না থাকলেও তাঁর সুদীর্ঘ জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের জন্য ভবিষ্যত জীবন চলার পথে পাথেয় হয়ে থাকবে। তিনি আমাদের জন্য রেখে গেছেন তাঁর আদর্শ, মহৎ কর্ম, তাঁর লিখিত বই, তাঁর ওয়াজ। তাঁর হাজার হাজার শিষ্য।